১৯৬১ সালের ১৩ই অগাস্ট, অর্থাৎ ৬১ বছর আগে তদানিন্তন কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানি বা জিডিআর বিশ্বকে চমকে দিয়ে বার্লিন প্রাচীর তৈরি শুরু করে৷ এসময় পুবের মানুষের কাছে সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে পৌঁছতে চেয়েছেন পশ্চিমের বহু শিল্পী৷ কিন্তু প্রায়ই পূর্ব জার্মানির শাসকগোষ্ঠী তাতে বাদ সাধে৷ অনুমতি না পেয়ে তৎকালীন পূর্ব জার্মান শীর্ষ নেতা এরিশ হোনেকারকে উদ্দেশ্য করে গান বাঁধেন জার্মানির জনপ্রিয় রক সঙ্গীত তারকা উডো লিন্ডেনব্যার্গ। গান হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা। সেই ভাষা পূর্ব ও পশ্চিমি শক্তির মধ্যে শীতল যুদ্ধে দেয় নতুন মাত্রা। এর ২৮ বছর পর ১৯৮৯ সালে পূর্ব জার্মানির জনগণের শান্তিপুর্ণ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ধ্বসে পড়ে বার্লিন প্রাচীর, পতন হয় শীতল যুদ্ধের৷ ব্যালাড আঙ্গিকে ‘উইন্ড ওফ চেইঞ্জ’ দিয়ে এই রাজনৈতিক পালাবদলকে সম্মাননা জানায় জার্মান সঙ্গীত গোষ্ঠি ‘স্করপিয়নস’।
বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোর ছয়টায় এবং স্থানীয় সময় সন্ধ্যা গড়াতেই নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে বদলে যাওয়া ডিজিটাল বাংলাদেশ-কে স্বাগত জানিয়ে গাইলেন হ্যানোভার থেকে জন্মনেয়া বিশ্বের রক ব্যান্ডদের অ্যাম্বাসেডর। ‘জয় বাংলা’ বলে আগামীর শিশুদের সাইবার নিরাপত্তায় গাইলেন রুডলফ শেঙ্কারের দল।

৫০ বছর আগে (১৯৭১ সালের ১ আগস্ট) এই একই মঞ্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষে গান করেছিলেন বিখ্যাত সেতার শিল্পী পন্ডিত রবিশঙ্কর এবং তার বন্ধু জর্জ হ্যারিসন। তাঁদের সফল উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে এবার একই ভেন্যুতে এই ‘গোল্ডেন জুবলি বাংলাদেশ কনসার্ট’ করলো বাংলাদেশ। আইসিটি বিভাগ ও হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্যোগে কনসার্ট শুরু হয় কোরসা কণ্ঠের ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কনসার্টে এবারই প্রথম দাঁড়িয়ে আবেগ দিয়ে বাংলাদেশীদের সাথেও গলা ছেড়ে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত গাইলেন ভিনদেশীরাও। ‘বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ’, ‘লক্ষ মুজিবরের কন্ঠস্বরের ধ্বনি, প্রতিধ্বনি, জয় বাংলা বাংলার জয় গানে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার হয়ে ওঠে বাংলাদেশ প্রতিচ্ছবি।
লাল-সবুজ আলোর সম্মহোনে মঞ্চে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে অতিথিদের স্বাগত জানান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম. মোজাম্মেল হক, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সংসদ সদস্য এ কে এম শামীন ওসমান, অ্যাডভোকেট নূরুল আমিন রুহুল, সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য নাহিদ ইজাহার খান, অপরাজিতা হক, সাইমন গর্ডেন এবং কাদেরী কিবরিয়া।
এসময় দর্শক সারিতে সপরিবারে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম বিশ্বকে বুদ্ধিবৃত্তিক সেবা দেয়ার জন্য কাজ করছে বলে জানিয়েছেন তিনি। বলেছেন, ‘আমাদের তরুণ প্রজন্ম হাইটেক সেন্টারগুলোতে কাজ করছে। সেগুলোকে আমরা নলেজ ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে গড়ে তুলেছি।’
অনুষ্ঠানের শুরুতে মহান একাত্তরে বিজয় থেকে বর্তমান বাংলাদেশের ওপরে তথ্যচিত্র দেখানো হয়। তিন মিনিটের এই ভিডিওতে উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের প্রথম প্রহর, মুক্তি সংগ্রাম, বাংলাদেশের মাথা তুলে দাঁড়ানো, উন্নয়ন, কৃষ্টি ও ঐতিহ্য।

‘লেট দ্য মিউজিক স্পিক’ শিরোনামের এই কনসার্টের আগে দেয়া স্বাগত বক্তব্যে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, এই কনসার্টের টিকিটের অর্থ দিয়ে গ্লোবাল সাইবার সিকিউরিটি ক্যাম্পেইনের জন্য তহবিল গঠন করা হবে। তরুণ ও শিশুদের সাইবার সুরক্ষায় জাতিসংঘের ইউএনডিপি প্রকল্পের সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বে পরিচালিত হবে এই কার্যক্রম। আগামী বছর থেকে চালু করা হবে ইউএনডিপি বাংলাদেশ-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড অন সাইবার সেফটি অ্যাওয়ারনেস। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে রূপান্তরের জন্য চারটি ভিত্তির ওপর বাংলাদেশ গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। এ জন্য আমি তাঁর প্রতি স্যালুট জানাচ্ছি।
তিনি আরো বলেন, ‘মাননীয় উপদেষ্টা জনাব সজীব ওয়াজেদ এর দিক নির্দেশনায় বাংলাদেশ “ডিজিটাল বাংলাদেশ” এ রূপান্তরিত হয়েছে। ২০৩১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ উচ্চ মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশের সারিতে উন্নীত হবে।’
বক্তব্যে ভারত সরকার, জাতিসংঘসহ যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দিয়ে শক্তি যুগিয়েছেন বিশেষ করে পন্ডিত রবি শঙ্কর এবং জর্জ হ্যারিসনের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান পলক।
এরপরই তার সঙ্গে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে জেগে ওঠে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন। পরক্ষণেই ‘স্লামলাইকুম, হ্যালো ওয়ার্ল্ড’ সম্বোধনে আলো আঁধারিরে মধ্যে মঞ্চে হাজির হন বাংলাদেশের ব্যান্ড চিরকুট দলের ভোকাল শারমিন সুলতানা সুমী। ‘ধন-ধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’ গানে শুরু হয় এই সঙ্গীত সন্ধ্যা।
রাত ১০টার দিকে গানে গানে ভালোবাসার জয়গান গেয়ে মঞ্চে আসে জার্মানির হানোফার শহর থেকে আগত হেভি মেটাল অ্যান্ড রক সঙ্গীত ব্যান্ড ‘স্কর্পিয়ন্স’।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে দর্শক-শ্রোতারা শুধু গানই উপভোগ করেননি; নেচে গেয়ে তারাও শরিক হন এই কনসার্টে। সুন্দর সকালের প্রত্যাশায় সমস্বরে গাইতে থাকেন তারা। অনুষ্ঠানে চিরকুট ২০ মিনিট এবং স্করপিয়নস দেড় ঘণ্টার পরিবেশনায় অংশ নেয়। বাংলাদেশের বিশ্ববন্ধুদের জন্য তৈরি তাদের নতুন গান পরিবেশন করে চিরকুট। আর মঞ্চ সাজাতে ৩৫ মিনিটের অধিক সময় ক্ষেপণ করে স্করপিয়নস । তবে দলটির শিল্পীরা পর্দা উঠানোর পর নেচে উঠে গোটা মিলনায়তন।

সূত্রমতে, বাংলাদেশ থেকে সহ আয়োজক বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকর্ণ কুমার ঘোষসহ সরকারি পর্যায়ের অর্ধশতাধিক কর্মকর্তারা ছাড়াও এই ঐতিহাসিক কনসার্টে অংশ নিয়েছেন আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার জয়ী সাদাত রহমান, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি সুব্রত সরকার, আইএসপিএবি সভাপতি ইমদাদুল হক, সিনিয়র সহ সভাপতি সাইফুল ইসলাম সিদ্দিক এবং বাক্কো সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ হোসেন সহ ব্যবসায়ী নেতারাও। ২০ হাজার আসনবিশিষ্ট মিলনায়তনের অধিকাংশই ছিলো পরিপূর্ণ। দর্শকের মধ্যে ৯০ শতাংশই ছিল বিদেশী। এর মধ্যে বাংলাদেশের শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার উপস্থিতি কনসার্টকে দেয় ভিন্নমাত্রা।